অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) আরও ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে এক নারীসহ ৩৬ জন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
উন্নত জীবনের আশায় অনেকে জমি ও গয়না বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা, কেউ কেউ ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়ায় তাদের শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের পরিবহনসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়।
ফেরত আসা ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালীর ২১ জন, লক্ষ্মীপুরের ২ জন এবং মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনার একজন করে রয়েছেন। এ নিয়ে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৩ জনে।
ফেরত আসা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশই প্রথমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে যান। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন।
নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় দালালদের হাতে প্রায় ৮০ লাখ টাকা তুলে দেন তিনি। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার বলেন, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন, যা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে নোয়াখালীর মির হাসান, রিয়াদুল ইসলাম ও রাকিব যথাক্রমে ৫৫, ৫০ ও ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করেও ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন।
শরিফুল হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যারা ফেরত আসছেন, তাদের বড় একটি অংশ ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন। সরকার যখন ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেয়, তখন তারা সেখানে প্রকৃত কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন কি না—তা যাচাই জরুরি। বিপুল অর্থ খরচ করে শূন্য হাতে ফিরে আসার দায় সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গেছেন, যার মধ্যে নোয়াখালীরই ৯৫১ জন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। নতুন করে ব্রাজিলে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার আগে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একাধিক দফায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন আইনে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হলে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই) প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় বিশেষ ও সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বেড়েছে বলে জানা গেছে।