রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন অনেক কার্যাদেশ প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই সংকট অব্যাহত থাকলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
রবিবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ) আয়োজিত ‘বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মো. মোফাজ্জল হোসেন পাভেল।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বারবার অবরোধ, লোডশেডিং এবং গ্যাসসংকটের কারণে কারখানাগুলো সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে পারছে না। ফলে নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে অনেক রপ্তানিকারককে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বিমানপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে রপ্তানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিকেএমইএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “আমরা এখন এক কঠিন সময় পার করছি। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন। যদি দ্রুত সমাধান না আসে, এই সংকট আরও গভীর হবে।”
বিজিবিএ’র মহাসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “গ্যাসসংকট ও প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হচ্ছেন বিমানপথে পণ্য পাঠাতে, যা তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।” তিনি সরকারের কাছে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্য অর্জনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “পোশাক খাত জাতীয় রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে, কিন্তু সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছি না।” তিনি আরও বলেন, “ঢাকা বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে, যার প্রভাব পড়ছে নতুন অর্ডার প্রাপ্তিতেও।”
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, বিমানবন্দরের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা—সব মিলিয়ে গার্মেন্ট খাত এখন সংকট ব্যবস্থাপনার খাতে পরিণত হয়েছে।”
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “আমেরিকার শুল্কনীতি ও শ্রমিক ইস্যুর জটিলতার কারণেও রপ্তানি অর্ডার কমছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা ক্ষমতায় এলে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেব, যাতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির সময় পান। বর্তমান সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত থেকে কিছু ব্যবসায়ী অর্থ লুট করেছেন, যার ফলে আর্থিক খাত নাজুক হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানিবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলব। অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে ব্যবসা-বান্ধব নীতি গ্রহণ করা হবে।”
এ সময় বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, “তিনি উন্মাদের মতো কথা বলেন। আমরা ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যেতে দেখছি, মানুষ চাকরি হারাচ্ছে—তবুও সঠিক পদক্ষেপ নেই। যেখানে বিমানবন্দর পোড়ে, সেখানে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার দেবে নাকি?” তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “নির্বাচন দিন, দেশকে মুক্তি দিন।”
সভায় বক্তারা একযোগে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি ছাড়া পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে।