আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র ও মাঠ প্রশাসন এবং পুলিশের মতামত শুনেছে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও অর্থ প্রবেশের ঝুঁকির বিষয়টি কমিশনের সামনে তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাসহ দুই শতাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিময় করে নির্বাচন কমিশন। কর্মকর্তারা জানান, ভোটের মাঠে নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফ্যাসিস্ট শক্তির তৎপরতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
এর আগে ২১ ডিসেম্বর তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। আজ বুধবার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলাদা বৈঠক করার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকের ধারাবাহিকতায় রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
মতবিনিময় সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রতিনিধি, আইজিপি, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাসহ মোট ২২৬ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। সকালে সভা শুরু হয়ে দুপুরের পর সমাপনী বক্তব্য দেন সিইসি। পরে স্বরাষ্ট্রসহ তিন উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার এক বিশেষ সহকারী মাঠ কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত নির্দেশনা দেন।
সমাপনী বক্তব্যে সিইসি অপতথ্য, গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর প্রচার এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত সুরাহা করতে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
সম্প্রতি ময়মনসিংহে একজনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সিইসি সম্প্রীতি বজায় রাখা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা যেন নিরাপদে কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন এবং শান্তিতে থাকতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, সর্বশক্তি ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব। তিনি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতা কামনা করেন। আইজিপি জানান, বর্তমানে বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে, যা এখন বন্ধ করার সময় এসেছে।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন জানান, অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজনদের আটক ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। তবে কিছু সংঘাতের ঝুঁকি রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আগে যারা দুষ্টুমি করেছে, তারা এখন বিভিন্ন দলের আড়ালে কাজ করার চেষ্টা করছে। জেলার প্রায় ১ হাজার ৯০০ ভোটকেন্দ্রের বিপরীতে পুলিশ জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, অধস্তনদের বদলি ও পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের হাতে কিছু ক্ষমতা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও সুবিধা হবে।
খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের জানান, সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় গণভোট বিষয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্গম এলাকায় বিশেষ চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সেখানে দ্রুত অস্ত্র উদ্ধার জরুরি।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার অপরাধীদের ঢালাও জামিন বন্ধে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। রাজশাহী পুলিশ কমিশনার এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের বিষয়ে বিটিআরসির সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানান এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ওপর গুরুত্ব দেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক উপস্থাপনা ভোটার উপস্থিতি কমাতে পারে। সিলেটের জেলা প্রশাসক দেশ-বিদেশ থেকে ছড়ানো ভুয়া খবর শনাক্তে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের পরামর্শ দেন। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের পোস্টিংয়ে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এক আসনের কর্মকর্তাকে অন্য আসনে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
সূত্র:বিডি প্রতিদিন