বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এখন দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক আর বিনিয়োগে কড়াকড়ির প্রভাব পড়ছে দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং বাড়তে থাকা ঋণের চাপ। অর্থনীতিবিদদের মতে, সময়মতো এসব ঝুঁকি চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে চলতি বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুটি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ। এসব ঝুঁকি কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ প্রবাহে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন নতুন বাধা সৃষ্টি করছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের ফলে বিশেষ ঝুঁকিতে পড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির চলমান টানাপোড়েন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো দেশের আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ প্রবাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু অভ্যন্তরীণ সংস্কার যথেষ্ট নয়; বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৌশল নির্ধারণ জরুরি। সুশাসন জোরদার, অপরাধ দমন, প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হয়ে উঠবে।
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির তৃতীয় বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং শিল্প ও ব্যবসা খাতে উৎপাদন ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি মিললেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে অর্থনৈতিক ধীরগতি। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ মিলিয়ে প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসও এই আশঙ্কাকে জোরালো করছে।
পঞ্চম এবং বড় ঝুঁকি হলো ঋণের বোঝা। সরকারি, করপোরেট এবং পারিবারিক পর্যায়ে ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় বাজেটে সুদ পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হওয়ায় উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঝুঁকি আলাদা নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে। অপরাধ ও অবৈধ অর্থনীতি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে, ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বাজার সংকুচিত করছে, আর মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন