২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ঢাকাসহ সারাদেশে সহিংসতায় বহু ছাত্র-জনতার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্যও নিহত হন। বিভিন্ন জেলার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, হবিগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে মোট ৪৪ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা এলাকায় সংঘর্ষে নিহত হন ১৫ জন পুলিশ সদস্য।
৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনরোষের আশঙ্কায় পুলিশ বাহিনীর বড় অংশ গা ঢাকা দেয়, ফলে দেশের বহু থানা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ফাঁকা থানাগুলোতে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও পুলিশ হত্যার বিষয়টি দীর্ঘ সময় অগ্রাধিকার পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে এবং তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনে নিহত পুলিশ সদস্যদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আংশিক তদন্ত হলেও তা আর এগোয়নি। এর একটি কারণ হিসেবে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশকে উল্লেখ করা হচ্ছে, যা চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। তবে পুলিশের দাবি, যেকোনো হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ৪৪ সদস্যের মধ্যে ঢাকাসহ আশুলিয়া এলাকায় ১৯ জন, গাজীপুরে ১ জন, কুমিল্লার তিতাস থানায় ২ জন, চাঁদপুরের কচুয়ায় ১ জন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে ২ জন, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের ১ জন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ১ জন, নারায়ণগঞ্জ পিবিআইতে ১ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন নিহত হন। সরকারি পর্যায়ে হামলার ঘটনাগুলোর তদন্তে সবুজ সংকেত পাওয়ায় তদন্ত পুনরায় শুরু বা জোরদারের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ৪৪ হলেও সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। রাজনৈতিক চাপ, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা তদন্তে প্রভাব ফেলেছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পুলিশ সদস্যই আসামি ১ হাজার ১৬৮ জন, যার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৬১২টি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বর্তমানে ৬৮টি মামলা তদন্ত করছে, যেখানে ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে সেগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের প্রমাণ সাপেক্ষে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানান।