৪০ লাখ পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্ব পেয়ে ৫ লাখ বই ছাপা না দিয়েই কাজ শেষের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে একটি ছাপাখানা। তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণার কথা স্বীকার করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, একই কায়দায় আরও অন্তত ছয়টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছে। এসব অনিয়ম ও বিলম্বের কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পরও দেশের অনেক স্কুলে এখনো সব বিষয়ের পাঠ্যবই পৌঁছায়নি। এতে দায় ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ‘বর্ণমালা প্রিন্টিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এবার ৪০ লাখ বই ছাপানোর কাজ পায়। তবে তারা ৩৫ লাখ বই ছাপিয়ে ৪০ লাখ বই ছাপানো হয়েছে—এমন প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে তদন্তে দেখা যায়, ৫ লাখ বই ছাপা না দিয়েই কাজ শেষের দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আবার বাকি বই ছাপানোর কাজ শুরু করেছে এবং প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেছে।
বর্ণমালা প্রিন্টিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোজাম্মেল হোসেন জানান, ব্যবস্থাপনাগত ভুলের কারণে এই ঘটনা ঘটেছে এবং এটি একটি অপরাধ। তিনি বলেন, অনিচ্ছাকৃত হলেও ভুলটি হয়েছে বলে তারা স্বীকার করছেন।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, শুধু একটি নয়—এ ধরনের অনিয়মে জড়িত রয়েছে আরও অন্তত ছয়টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। মুদ্রণ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুরো খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, নিম্নমানের বই সরবরাহ, বই না দিয়েও বিল উত্তোলন এবং বিলম্বে বই দিয়ে ভুয়া চালানের মাধ্যমে বিল নেওয়ার মতো অনিয়ম বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু এনসিটিবির পক্ষ থেকে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এসব অনিয়ম চলছেই।
এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ বলছে, বই বিতরণ কার্যক্রম শেষ হলে অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটির সদস্য অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী জানান, কোথাও কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে দরপত্রের বিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে এখনো অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব বিষয়ের বই না পৌঁছানোয় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষা গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা স্পষ্ট হলেও কার্যকর জবাবদিহি নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, সরকারের আন্তরিকতা ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। সময়মতো বই না পাওয়ায় যে শিক্ষাগত ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নিতে এখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি।