সাম্প্রতিক :

উন্নয়নে নজর নেই, তবু বাড়ছে বিদেশি ঋণ: অর্থনীতি ঝুঁকিতে

  • আপডেটের সময় : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমলেও বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। বাজেট ঘাটতি মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকার ক্রমেই দ্রুত ছাড়যোগ্য বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন যুক্ত হওয়ায় মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দেশের বিদেশি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এটি ২০২২ সালের জুনের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় সরকার উন্নয়ন প্রকল্পভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে বাজেট সহায়তা ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থাকলেও বাজেট সহায়তা ঋণ দ্রুত ছাড় হয় এবং সরাসরি ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা যায়। ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট ৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ পেয়েছে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এসেছে ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে প্রকল্প ঋণের ছাড় কমেছে ২৯ শতাংশেরও বেশি।

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও বিদেশি ঋণের চাপ বাড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে যেখানে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই মূলত এই অবমূল্যায়ন ঘটেছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের মোট ঋণ ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকায়। এতে জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া, বাকিটা বিদেশি ঋণ।

ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে দ্রুত। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকার সুদ বাবদ ব্যয় করেছে ৩১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বেড়েছে ১৯ শতাংশ এবং বিদেশি ঋণের সুদ বেড়েছে ৮০ শতাংশ, যা অর্থনীতিবিদদের উদ্বিগ্ন করছে। বিশেষ করে ট্রেজারি সিকিউরিটিজ ও জাতীয় সঞ্চয়পত্রে সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই এখন সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। একক খাত হিসেবে এটি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের ক্ষেত্র। পুরো অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত থাকলেও উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প কম নেওয়া এবং চলমান প্রকল্পে ব্যয় কম হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। জাপানি ইয়েনে নেওয়া ঋণ বাড়ায় মুদ্রা ঝুঁকিও বেড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে বাজেট সহায়তা ঋণ কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। তাদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, উচ্চ সুদের ঋণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত ফলদায়ক খাতে সীমিত ঋণ নেওয়াই ভবিষ্যতে এই চাপ সামাল দেওয়ার একমাত্র পথ।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরিতে আরো খবর
Japan Bangla Press © 2025. All Rights Reserved.
Site Customized By NewsTech.Com