যুদ্ধের দামামা যখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বাজে, তার প্রতিধ্বনি কেবল মরুভূমির বালিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং হাজার মাইল দূরের জনপদগুলোতেও তার কম্পন অনুভূত হয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এসে ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন সামরিক উত্তেজনা ঠিক সেই বার্তাই দিচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট মনে হলেও, এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জের নাম।
২০২৬ সালের মার্চের শুরুতেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২.০৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার মার্চের জন্য জ্বালানি তেলের দাম ফেব্রুয়ারি মাসের স্থিতাবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ মূলত একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। তেলের উচ্চমূল্য মানেই ডলারের বড় অংকের বহির্গমন।
ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়লে কৃষি সেচ, পণ্য পরিবহন এবং শিল্প কারখানার উৎপাদন খরচ এক লাফে বেড়ে যায়। সরকার যদি বাজারে দাম না বাড়ায়, তবে বাজেটে বিশাল অংকের ভর্তুকির বোঝা চেপে বসে, যা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে।
ইরান সংঘাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। যদি সংঘাতের কারণে এই পথ সাময়িকভাবেও রুদ্ধ হয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসবে।
ইতিমধ্যেই লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালে নিরাপত্তা সংকটের কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলো দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করছে। এতে শিপিং কস্ট বা জাহাজ ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পোশাক রপ্তানি এবং বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির সময় ও খরচ উভয়ই এখন ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল মেটাতে বেশি ডলারের প্রয়োজন হবে। এতে টাকার মান আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া হওয়া। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন অর্থনীতিতে এক ধরণের স্থবিরতা বা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ দেখা দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমানে আমাদের লাখ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত।
যদি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তবে এসব দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন থমকে যেতে পারে, যা সরাসরি নতুন শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে।
মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। তেলের দাম বাড়লে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় বাড়ে। ফলে তারা বড় বড় প্রজেক্ট নিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শ্রমের চাহিদা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে যুদ্ধের ডামাডোলে এই ইতিবাচক সম্ভাবনা সবসময় অনিশ্চিত থাকে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকা। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়, তবে পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে রপ্তানি আদেশ বা অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা ব্র্যান্ড ইমেজ নষ্ট করে।
যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না, যুদ্ধ হয় অর্থনীতির টেবিলে। এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।
কেবল তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) এবং আঞ্চলিক গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হবে। ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটে বাংলাদেশকে তার চিরাচরিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি বজায় রেখে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
বিলাসদ্রব্য আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানির জন্য ডলারের জোগান নিশ্চিত রাখা জরুরি। রপ্তানির জন্য কেবল ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজার ধরতে হবে।
বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো যুদ্ধই আর ‘অন্যের যুদ্ধ’ নয়। তেহরানের আকাশে যদি মিসাইল ওড়ে, তবে তার উত্তাপ ঢাকার কাঁচাবাজারে কিংবা সাধারণ মানুষের বিদ্যুতের বিলে অনুভূত হয়। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আমরা কত দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারি, তার ওপরই নির্ভর করবে আমাদের টিকে থাকা।