বাংলাদেশে নতুন কোনো অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। সংবাদ সম্মেলনে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং আওয়ামীপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট ও আইনজীবী নিঝুম মজুমদার।
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। সে কারণে এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
এ সংবাদ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরা। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতারা ওই প্রতিবেদনের তথ্যগত, আইনগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটির বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্য সঠিক নয় এবং এতে একাধিক গরমিল রয়েছে। আইনি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর লিগ্যাল টিমের প্রধান ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ এই তথ্যকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে বিক্ষোভকারীদের হাতে শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইবে কিনা—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান দলটির নেতারা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত দেড় বছরে এই প্রথম ভারতের রাজধানীতে আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী ভারতে আশ্রয় নিলেও এতদিন তাদের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এর আগে গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লির জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি মানবাধিকার সংগঠনের ব্যানারে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে তা বাতিল করা হয়। সে সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল, পর্যটক বা বাণিজ্যিক ভিসায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে হাছান মাহমুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তিনি বর্তমানে ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে অবস্থান করছেন এবং সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সফরের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে ভারতের সরাসরি কোনো দায় না থাকায় তাকে দিল্লিতে এই সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইভাবে লন্ডনপ্রবাসী আইনজীবী নিঝুম মজুমদারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।