পরিষ্কার রাস্তা, সময় মেনে চলা ট্রেন, অসাধারণ শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে জাপান যেন আধুনিক সভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। কিন্তু এই ঝকঝকে বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতার গল্প।
জাপানের ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে একা বাসায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৬,০২০ জন মানুষ। প্রতিদিন গড়ে ২০৮ জন। তাদের পাশে কেউ ছিল না, শেষ মুহূর্তে হাত ধরারও কেউ ছিল না।
এর মধ্যে হাজারো মানুষের মরদেহ পাওয়া গেছে মৃত্যুর বহুদিন পর—কারও এক মাস পরে, কারও এক বছর পরেও। এই ঘটনাকে জাপানে বলা হয় “কোদোকুশি”—অর্থাৎ একাকী মৃত্যু।
ভাবুন তো, একজন মানুষ সারা জীবন কাজ করেছে, সমাজকে দিয়েছে—কিন্তু শেষ সময়ে তাকে মনে করার মতো একজন মানুষও নেই। দরজার ফাঁক দিয়ে গন্ধ বের হলে, জমে থাকা বিল দেখে, তখন মানুষ বুঝতে পারে—সে আর নেই।
তাহলে প্রশ্নটা এখানেই—উন্নত দেশ মানে কী?
শুধু অর্থনীতি, অবকাঠামো, আর প্রযুক্তি?
নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন মানুষ হারিয়ে গেলে অন্তত কেউ তার খোঁজ নেয়?
জাপান আমাদের অনেক কিছু শেখায়—শৃঙ্খলা, সততা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা। এগুলো অবশ্যই শেখার মতো।
কিন্তু মানুষে মানুষে দূরত্ব? সেটি নয়।
আমাদের সমাজে এখনো আছে—
মায়ের ডাক, বাবার অপেক্ষা, একসাথে খাওয়া, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ানো।
অনেকে এগুলোকে পিছিয়ে থাকা বলে। কিন্তু আসলে এগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কারণ মানুষ শুধু প্রযুক্তি দিয়ে বাঁচে না—
মানুষ বাঁচে সম্পর্ক দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে, পাশে থাকার নিশ্চয়তা দিয়ে।
জাপান দেখিয়েছে কীভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়।
কিন্তু এটাও দেখাচ্ছে—অতিরিক্ত একাকীত্ব মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।
তাই জাপানকে সম্মান করুন, শিখুন—
কিন্তু অন্ধভাবে অনুকরণ করবেন না।
কারণ এমন উন্নয়ন, যেখানে মৃত্যুর পরও কেউ খোঁজ নেয় না, সেটা উন্নয়ন নয়, সেটি এক নীরব বিপর্যয়।
— শাহীন আকন
ওকিনাওয়া, জাপান