সারাদেশে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণের প্রকল্প বাতিল করে দিল ইউনূস সরকার!

  • আপডেটের সময় : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫

সারাদেশে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণের জন্য ২০ হাজার সমাধি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৮ সালে ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ‘শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪৬১ কোটি টাকা। ৭ বছরে বাস্তবায়িত হয় ৪ হাজার ৩৭১টি সমাধিস্থল। ইতিমধ্যে এই খাতে ব্যয় হয় প্রায় ৮২ কোটি টাকা।

গত বছর জুলাই-আগস্টের দাঙ্গার মাধ্যমে দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য, স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মাধ্যমে ক্ষমতারোহন করা ড. ইউনূসের সরকার শহিদ সমাধিথ সংরক্ষণের প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রেখেই বাতিল করে দিলো। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তর।

প্রকল্প বাতিলের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও প্রকল্প পরিচালক পলি কর বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম প্রকল্পটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করার আগেই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এই প্রকল্প বাতিলের অনুমতি দেন। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করার জন্য উপস্থাপন করা হয়।

নথিপত্রের বিবরণীতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের মাধ্যমে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সময়ে মৃত্যুরবণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। প্রকল্পটি ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেটে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়।

প্রকল্পটির প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৬০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ৩ বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। কিছুটা কাজও হয়। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হলে দাঁড়ায় ৪৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পটি পিছিয়ে গেলে পরে আবার সংশোধন করা হলে বাস্তবায়নকাল বৃদ্ধি পায় ৩ বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সুপারিশে আরও এক বছর সময় বাড়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটিতে গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন অভিযোগে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল হয়েছেন অন্তত পাঁচবার। পলি কর ছিলেন শেষ পিডি। অর্থ বরাদ্দ ধীর গতির হওয়ায় এবং করোনা মহামারির কারণে সময়মত শেখ করা যায়নি প্রকল্পটি। ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৩৭১টি সমাধিস্থলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে।

স্বাধীনতাবিরোধীদের সংঘটিত দাঙ্গায় আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। তিনি গত ২৩শে মার্চ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন অগ্রগতির সভায় দাবি করেন, সমাধি নির্মাণের জন্য জমি পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রকল্পটি থেকে সরে এসেছেন তারা।

৫ হাজার সমাধি করার সিদ্ধান্ত হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের দেওয়া তালিকা মোতাবেক। আর ১৫ হাজার সমাধি করার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) তালিকা অনুযায়ী। এভাবে মোট ২০ হাজার সমাধি নির্মাণের লক্ষ্য ধরা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। মূলত সেসব স্থানে সমাধি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সমাধি নির্মাণে কিছু জটিলতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন- স্বাধীনতার এত বছর পর অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে কিছু জায়গায় শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির স্থান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিকল্প স্থানে সমাধি করতে চাহিদা অনুযায়ী জমি পেতে সমস্যা, সমাধির নকশা নিয়ে নানা মত এবং বাৎসরিক অর্থ বরাদ্দ পেতে বিলম্ব। ফলে অনুমোদনের পরেও প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

বাতিল করা প্রকল্পটি যেভাবে সমাপ্ত দেখানো হচ্ছে

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি বিভাগরে সাবেক পরিচালক (উপসচিব) নিশাত জাহান বলেন, নির্দেশ মোতাবেক প্রকল্পের আওতাধীন সমাধিস্থল পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন আইএমইডি সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমার জানা নেই।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গত ২৩শে মার্চ জানান, জমি পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রকল্পটি বাতিল করা হচ্ছে। এরপর অসম্পূর্ণ রেখেই প্রকল্পটি ‘সমাপ্ত’ করতে ডিপিপি পাঠান পরিকল্পনা কমিশনে। গত ৯ই জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি তুলে সংশোধন করে ডিপিপি পাঠানো হয় আবার পরিকল্পনা কমিশনে।

এরপর সংশ্লিষ্ট সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম প্রকল্পটি বাতিলের ব্যাপারে মতামত দিয়ে বলেন, ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে অসাপ্ত থেকে সমাপ্তকরণে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলো। তার সুপারিশের পরই পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত ২০শে অক্টোবর এই প্রকল্প বাতিলের অনুমোদন দেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত, বলছেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ

এভাবে এমন একটি মহতী উদ্যোগ বাতিলের মাধ্যমে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দেশের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচিতিকে মুছে ফেলার একটি উদ্যোগ নিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীরা- এমনটাই বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মো. কাশেম।

তিনি আরও বলেন, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, সেই শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি স্থায়ী করে রাখার মাধ্যমে সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু বর্তমান রাজাকার সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতেই প্রকল্পটি বাতিল করে দিলো। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই শহিদদের চিনতে না পারে।

একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, ব্লগার, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক লেখালেখিতে যুক্ত নেটিজেনরাও বলছেন- জামায়াত ও রাজাকারবান্ধব ইউনূস সরকার জুলাই দাঙ্গায় নিহতদের নামে স্তম্ভ বানাতে ব্যস্ত। এতে বাজেট, স্থান সংকুলানের অভাব হয় না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের সমাধি নির্মাণের প্রকল্প তারা বাতিল করবে, এটা অনুমিত ছিল।

তারা বলছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ধ্বংস করে দিয়েই ক্ষমতার দখল নিয়েছে, তাদের হাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন আশাও করা যায় না।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরিতে আরো খবর
Japan Bangla Press © 2025. All Rights Reserved.
Site Customized By NewsTech.Com