শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস–এর বহুল আলোচিত দর্শন ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার একটি বড় সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। তবে সমালোচকদের মতে, তিনি সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি এবং তাঁর দায়িত্বকালে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের পছন্দ অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেন এবং বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনও পান। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার এনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের দাবি, তাঁর সময় অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক নিম্নমুখী ছিল। শিল্প উৎপাদন কমেছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ আসেনি। আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বেকারত্ব ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার কমে গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
সরকারি বিনিয়োগও কমে যায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং তা মোট ঋণের বড় অংশে পরিণত হয়।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধানও মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে। মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। যদিও একই সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বাড়ে, তবু সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতির অনেকগুলোই পূরণ হয়নি। তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, নিয়োগ ও নীতিনির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচকদের মতে, দায়িত্বকাল শেষে অর্থনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফলে তাঁর ঘোষিত ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—লক্ষ্য অর্জন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।