২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীটির ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। আগের পোশাক জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে—এমন যুক্তিতে নতুন পোশাক চালু করা হলেও শুরু থেকেই এ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে রঙ ও মান নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক দুজন উপদেষ্টা, একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং পুলিশের ভেতরের একদল প্রভাবশালী কর্মকর্তার সিদ্ধান্তেই ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হয়। নতুন পোশাক বাস্তবায়নে অন্তত শতকোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে ইউনিফর্ম তৈরি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাহিনীর ভেতর থেকেই আগের ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে এক বিবৃতিতে আগের পোশাককে পুলিশের ঐতিহ্য উল্লেখ করে তা পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরেও এ নিয়ে বিশেষ বৈঠক হয়েছে বলে এক ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান। তার ভাষ্য, বর্তমান ইউনিফর্ম দেখতে অনেকটা বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের মতো হওয়ায় বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার জোর করেই নিম্নমানের কাপড় ও অরুচিকর রঙের পোশাক ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে পোশাক পরিবর্তনের পেছনে সাবেক কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও একটি সিন্ডিকেটের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন।
পুলিশ সংশ্লিষ্টরা জানান, বাহিনী সংস্কারের অংশ হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে লৌহ রঙের নতুন ইউনিফর্ম চালু করা হয়। তবে তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। নতুন পোশাকের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পোশাকের সাদৃশ্য থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব বিষয় নতুন সরকারের নজরে এসেছে এবং পুরনো ইউনিফর্মে ফেরার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, নতুন পোশাক বাহিনীর মনোবল বাড়াবে—এমন আশা করা হলেও বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং সমালোচনা বেড়েছে। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মদ বলেন, শুধু পোশাকের রঙ বদলালে হবে না; পুলিশের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। প্রশিক্ষণ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ বাড়ানো হলে বাহিনীর ভাবমূর্তি উন্নত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিফর্ম পরিবর্তনের চেয়ে জনবান্ধব ও পেশাদার পুলিশ গড়ে তুলতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে একাধিকবার ইউনিফর্ম পরিবর্তন হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি—এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে।